আজ: ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং, রবিবার, ২ পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১০ রবিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী, রাত ৮:৫২
সর্বশেষ সংবাদ
অপরাধ, প্রধান সংবাদ, রাজনীতি জাসাসের পদ মেলে টাকায়

জাসাসের পদ মেলে টাকায়


পোস্ট করেছেন: নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ১০/০৯/২০১৭ , ২:৩১ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: অপরাধ,প্রধান সংবাদ,রাজনীতি


Spread the love
Spread the love

ভোরের খবর ডেস্ক- বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা- জাসাসের নেতাদের বিরদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ উঠেছে। তাদের বিরুদ্ধে নগদ টাকায় পদ বিক্রির অভিযোগ প্রকাশ্যে করেছেন সংগঠনের ত্যাগী নেতাকর্মী ও ভুক্তভোগীরা। তারা অভিযোগ করে বলেন, রাজনৈতিক কিংবা সাংগঠনিক যোগ্যতা নয়, নেতৃত্ব বাছাইয়ের আগে জানতে চাওয়া হয়- টাকা কেমন আছে। নেতার টাকাও নেই আর পদও নেই। এমন অবস্থাই বিরাজ করছে জাসাসে। এই কমিটির প্রায় এক বছরের মেয়াদকালে কেন্দ্রীয় কমিটিকে সংগঠিত করতে না পারলেও জেলা কমিটি গঠনে অর্থ-বাণিজ্যের বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। আর এসব অভিযোগের কারণে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন জাসাস পদবঞ্চিত নেতাকর্মীসহ সাধারণ কর্মীরা। এ রকম একটি অভিযোগ উঠেছে হবিগঞ্জ জেলা জাসাস কমিটির ক্ষেত্রে। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হেলাল খান তার কথিত আত্মীয়কে জেলা জাসাসের সভাপতি করেছেন। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে যারা এই সংগঠনকে ধারণ করছেন, সংগঠিত করেছেন তাদের বাদ দেয়া হয়েছে।

এক্ষেত্রে হেলাল ত্যাগী নেতাদের এই বলে আশ্বস্ত করেন, দল চালাতে টাকা লাগে। আপনাদের সেটা নেই- এমন অভিযোগ করে জেলা জাসাসের সাবেক সভাপতি শাহ আলম চৌধুরী মিন্টু বলেন, আমি ১৯৮৮ সাল থেকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমি এই আদর্শকে ধারণ করছি। বিগত আন্দোলনে আমার বিরুদ্ধে ২৫টির মতো মামলা রয়েছে। আবার আমাদের কমিটিতে যেমন জেলার বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, লেখক, সাংবাদিকসহ নানা পেশার সমারোহ ঘটিয়েছিলাম এমন যদি কমিটি গঠন করা হতো তাহলে আমাদের কোনো আপত্তি থাকত না। কিংবা আমাদের সঙ্গে পরামর্শ করে কমিটি গঠন করা হলেও এ রকমটা হতে পারত না।

জাসাসকে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া জেলার খ্যাতমান নাট্যশিল্পী, সংগীতশিল্পী হিসেবে পরিচিত মিন্টু বলেন, জাসাসের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার পর থেকে আমি হেলাল খানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতাম। কিন্তু হবিগঞ্জ জেলা কমিটি ঘোষণার কয়েকদিন আগে তিনি মোবাইলে জানান, মিন্টু সাহেব আপনার তো তেমন টাকা-পয়সা নেই। কিন্তু সংগঠন চালাতে টাকার প্রয়োজন। কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেতাকর্মীদের পেছনে টাকা খরচ করতে হয়। আপনার তা নেই। এর কিছুদিন পরই তিনি রাতের অন্ধকারে এই কমিটি ঘোষণা করেন।

হবিগঞ্জ জেলা বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, কোরবানির ঈদের একদিন আগে ১ সেপ্টেম্বর এই কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় জাসাস। কমিটিতে ক্বারী মিজানকে সভাপতি, শাহ ফারুককে সাধারণ সম্পাদক এবং আলী হোসেন সোহাগকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ৫১ সদস্যের জেলা কমিটি করা হয়। এর মধ্যে ক্বারী মিজান ২০১৪ সালে খেলাফত মজলিশ থেকে বিএনপিতে যোগদান করে জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের দায়িত্ব পালন করেন। সেখান থেকে তাকে বহিষ্কার করা হলে তিনি জাসাস নামের একটি সংগঠনের জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। যা এখনো চলমান রয়েছে।
অপরদিকে সাংস্কৃতিক জগতের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করা এক ধর্মীয় ক্বারী কিভাবে জাসাসকে সংগঠিত করবেন তা নিয়েও নেতাকর্মীরা সংক্ষুব্ধ। সাধারণ সম্পাদক শাহ্ ফারুক একজন কাপড় ব্যবসায়ী। সাংগঠনিক সম্পাদক একজন ঠিকাদার। এ রকমভাবে ঘোষিত এই কমিটিতে শিল্পী সাংস্কৃতিক মানসিকতার কোনো ব্যক্তিকে রাখা হয়নি বলেও অভিযোগ জেলা বিএনপির নেতাদের।

ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা জেলা জাসাসের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি আবুল কালাম আজাদ টিপু বলেন, ঘোষিত কমিটিতে যাদের নাম রাখা হয়েছে তাদের মধ্যে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক কখনো জাসাস তো দূরের কথা বিএনপির কোনো অঙ্গ সংগঠনেই ছিলেন না। আর অন্যদের মধ্যে অধিকাংশই জাসাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না।

সারাদেশের জাসাসের শতভাগ মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বিরাজমান থাকলেও অপেক্ষাকৃত কম সময়ের মেয়াদ শেষ করা এই কমিটিকে এত তাড়াহুড়া করে পুনর্গঠনে অবাক হয়েছেন জেলার সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। তারা বলেন, জাসাসের মালেক-মনির কেন্দ্রীয় কমিটি এই কমিটির অনুমোদন করেছিলেন। এসব বিষয়ে জেলা জাসাসের সভাপতি ক্বারী মিজানের কাছে জানতে চাইলে তিনি ফোনের লাইন কেটে দেন।

একই রকমভাবে সারাদেশে কেন্দ্রীয় জাসাস যে সব কমিটি ঘোষণা করেছে সবগুলোতেই বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। সিলেট মহানগর, চট্টগ্রাম মহানগরসহ অন্যান্য কমিটি গঠনে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ করেছেন সংগঠনটির ত্যাগী নেতাকর্মীরা।

সিলেট মহানগর জাসাসের সহসভাপতি জালালউদ্দিন শামীম জানান, আমি বিগত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলাম। বর্তমান কমিটিতে আমাকে ২৩ নম্বর সহ-সভাপতি করা হয়েছে। তিনি কমিটি গঠনে নানা অনিয়ম আর অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করে বলেন, আমাদের জাসাসের নেতারা এখন প্রকাশ্যেই বলছেন- যাদের টাকা আছে, গাড়ি-বাড়ি আছে তাদেরই কমিটিতে দায়িত্ব দেয়া হবে। সাংগঠনিক কিংবা রাজনৈতিক দক্ষতা তাদের কাছে মুখ্য নয়।

বিএনপি দলীয় সূত্র জানায়, এ বছরের জানুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. মামুন আহমেদকে সভাপতি ও চিত্রনায়ক হেলাল খানকে সাধারণ সম্পাদক করে জাসাসের ৩০ সদস্যের (আংশিক) কমিটি ঘোষণা করা হয়। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার পরামর্শক্রমে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ কমিটি অনুমোদন করেন। কিন্তু তাদের সেই আংশিক কমিটি এখনো পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করতে পারে নাই। তবে জাসাসের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা হওয়ার রাতেই তড়িঘড়ি করে ঢাকা মহানগর দুই কমিটি (উত্তর ও দক্ষিণ) বিলুপ্ত করে এক মহানগরের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেছেন নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। মধ্যরাতের এই কমিটি ঘোষণার কারণ সম্পর্কেও অন্ধকারে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। আবার মহানগর কমিটির অবস্থাও এখন যেন লেজেগোবরে। কোথাও নেই জাসাস।

সংগঠনটির নেতাকর্মীরা জানান, জাসাস দেশের কৃষ্টি কালচার আর সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে দলকে এগিয়ে নিয়ে যায়। রাজপথের আন্দোলনে তেজদীপ্ত রূপরেখা তৈরি করতে আর সমাজের বিভিন্ন পেশার সমারোহ ঘটিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনকে ফুটিয়ে তোলে। কিন্তু ঘোষিত কমিটিতে রাজনীতির বাইরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে এক প্লাটফর্মে নিয়ে আসা দূরের কথা, এখন কেউ এই সংগঠন করতেও চাইছে না। অন্যদিকে জাসাস কমিটি এখন ত্রিধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এর একদিকে আছে সভাপতি অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক। এর বাইরে জাসাস কমিটির নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে পরিচিত চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা গাজী মাযহারুল আনোয়ার। সভাপতি ড. মামুন আহমেদ অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে ইতিমধ্যে সাধারণ নেতাকর্মীদের মাঝে নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারলেও কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় শক্ত অবস্থানে থাকতে পারছেন না বলে নেতাকর্মীরা জানান। সংগঠনের বিষয়ে জানতে চাইলে হেলাল খান জানান, হবিগঞ্জ জেলার সাবেক কমিটিতে মিজান পদবঞ্চিত ছিলেন। তাদের নতুন কমিটিতে নিয়ে আসা হয়েছে।

কিন্তু ক্বারী মিজান ২০১৪ সালে বিএনপিতে যোগদান এবং ওলামা দলে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয় আমি কিছু জানি না। কেন্দ্রীয় কমিটির বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি তৈরি করা আছে। ম্যাডাম লন্ডন থেকে আসলেই ঘোষণা করা হবে। সভাপতি ড. মামুন আহমেদ বলেন, নিয়ম মাফিক আমাদের কেন্দ্রকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়ে জেলা পর্যায়ের কমিটি গঠনের পরিকল্পনা থাকলেও চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা গাজী মাযহারুল আনোয়ার ও দলের সংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক নায়ক উজ্জ্বল আর জাসাস সাধারণ সম্পাদক হেলাল খানের পরামর্শে কিছু জেলা কমিটি গঠন করা হয়। এখানে আমাকে বলা হয়েছিল- যাদের নেতৃত্বে আনা হয়েছে তারাই যোগ্য। এর বাইরে আমার বেশি কিছু বলার নেই।

Share

Comments

comments

Close