আজ: ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, সোমবার, ১৪ ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ১০ জমাদিউস-সানি, ১৪৩৯ হিজরী, রাত ৩:৪০
সর্বশেষ সংবাদ
ফেসবুক থেকে ফিরিয়ে দাও বাঙালী জাতীয়তাবাদ

ফিরিয়ে দাও বাঙালী জাতীয়তাবাদ


পোস্ট করেছেন: নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ০১/২৩/২০১৮ , ৩:২৩ অপরাহ্ণ | বিভাগ: ফেসবুক থেকে


দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়। এর পর পরই ভাষার প্রশ্নে শুরু হয় বাঙালিদের আন্দোলন। এ আন্দোলনের সফলতা বাঙালি জাতিসত্ত্বা বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় অর্জন। জাতিসত্ত্বা বিকাশের অগ্রযাত্রা শুরু এখান থেকেই। ভাষা আন্দোলনের মত একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন খুলে দেয় বাঙালির রাজনৈতিক পরিচয়ের দুয়ার। সারাদেশে বাঙালিয়ানার জাগরণ ঘটতে থাকে। সর্বস্তরের মানুষের মননে এর প্রভাব লক্ষ করা যায়। ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকেই সে সময়ে শুরু হয় সর্বস্তরে বাংলাভাষা ব্যবহার। অফিস, আদালত, দোকানপাঠের সাইনবোর্ড, যানবাহনের নামসহ সর্বক্ষেত্রে বাংলায় লেখা এবং বাংলা নামের ব্যবহার শুরু হয়। তৎকালিন রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও জোড়াল ভূমিকা রাখে এক্ষেত্রে। মানুষের চিন্তা-চেতনায় অসাম্প্রদায়িকতার বিষয়টি স্থান পেতে শুরু করে। যে মুসলিম ধর্মীয় উন্মাদনা নিয়ে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র গঠিত হয় তার অসারতা ফুটে উঠতে থাকে। জাগ্রত হতে থাকে অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধ। ভাষা আন্দোলনের প্রভাব লক্ষ করা যায় গোটা পাকিস্তানের রাজনীতিতেও। ভাষা আন্দোলনের প্রভাবেই পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে (১৯৫৪ সালে) যুক্তফ্রন্টের কাছে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয় হয়। অপরদিকে ১৯৫৩ সালে আওয়ামী মুসলীম লীগ নাম নিয়ে গঠিত দলটি এদশকেই মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ নামকরণ করে।
গোটা ৫০ এবং ৬০ এর দশক জুড়েই বাঙালি জাতিসত্ত্বার বিকাশ ঘটতে থাকে। এ সময়ে লক্ষ করা যায় যে, রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও বাঙালি পরিচয়টি স্থান পেতে শুরু করে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের অবকাঠামো সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে দেশের রাজনীতি পরিচালত হতে থাকে। ৬২’র শিক্ষানীতি আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফার আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, সর্বপরি ৭০’র নির্বাচনের মাধ্যমে বাঙালি তার প্রকৃত পরিচয় খুঁজে পায়। আর মহান মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতিসত্ত্বার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে বাঙালি মুলত একটি জাতিরাষ্ট্র গঠন করে যার নাম ‘বাংলাদেশ’। রাজা রামহোন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা তারও আগ থেকে যে বাঙালির পথ চলা শুরু তার বিশ্বপরিচয় ঘটে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে।
অপরদিকে এই বাঙালি জাতিসত্ত্বার ওপর চরম আঘাত আসে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশেই ১৯৭৫ সালে। যুগযুগ ধরে গড়ে ওঠা বাঙালি জাতির পরিচয়টিই মুছে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর। রাষ্ট্রের সংবিধান স্বীকৃত জাতিসত্ত্বার পরিচয়টিও বদলে দেওয়া হয় এক কলমের খোঁচায়। সংবিধানে জুড়ে দেওয়া হয় বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। অথচ ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগিরকের জন্য এ সংবিধান। এ সময়েই নাগরিকত্বের বিষয়টিকে জাতীয়তা হিসেবে অবৈজ্ঞানিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়। অসাম্প্রদায়িকতার গৌরবকে পদদলিত করে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। দেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের রাষ্ট্রীয় মদদে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মদদ দেওয়া, যুদ্ধাপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে আনা (গোলাম আজম) ও তাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনে সুযোগ করে দেওয়াসহ রাষ্ট্রবিরোধী নানা কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় এ সময়ে। প্রকৃতপক্ষে বাঙালি জাতির দীর্ঘ দিনের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে রাষ্ট্রের অবকাঠামোর রাইরে ভিন্ন রাজনীতি চালু করা হয় দেশে। এরফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও বিভক্তি ঘটে। গোটা দেশবাসির মধ্যে দু’টি মেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, অপরটি অবৈজ্ঞানিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তাবাদ। একপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় (বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র) বিশ্বাসী, অপরদিকে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। এ মেরুকরণের ফলে দেশের প্রশ্নে বা জাতীয়তার প্রশ্নে বা দেশের গণমানুষের প্রশ্নে আর কখনই গোটা জাতি এক হতে পারেনি। হয়তো আগামীতেও তা আর সম্ভব হবে না।
বাঙালি জাতিসত্ত্বার পরিচয় মুছে দেওয়ার অপরাজনীতি শুরু করেন জেনারেল জিয়া। আরেক জেনারেল এরশাদ সেই রাজনীতির ধারাকে আরো প্রসারিত করেন। তারপর যে আন্দোলন শুরু হয় এরশাদের অবৈধ ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে, সেখানেও সাম্প্রদায়িক দলগুলো স্থান করে নেয়। এ সুবাদে তারা নিজেদের গণতন্ত্রী পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করে। এরশাদ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলাকালেই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে তৎকালিন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ। জামায়াত নেতার পরিচয় লুকিয়ে রেখে ধর্মীয় জলসার নামে রাজনীতি করতে থাকে দেলায়ার হোসেন সাঈদী (দেলু রাজাকার)। মসজিদ সমাজের ব্যানারে বিভিন্ন স্থানে যেসব জলসার আয়োজন করা হতো, ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ তা প্রতিহত করা শুরু করে। উপায় না দেখে দেলু রাজাকার তার আসল পরিচয়ে ফিরে যায়। কিন্তু এরশাদের পতনের পর সরকার গঠনে বিএনপি’র যথেষ্ট সংসদস্য না হওয়ায় জামায়াতে ইসলামের সহায়তা নেয়। এভাবেই রাষ্ট্র পরিচালনায় জামায়াত অংশ নেয়া শুরু করে। এ সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মমূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি যুদ্ধাপরাধীদের বিরেুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। এ আন্দোলনের মাধ্যমে জামায়াতের মুখোশ উন্মোচন করা হয় এবং জনগণের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের মধ্যে একটি ঐক্য গড়ে ওঠে। কিন্তু দেখা গেল বিএনপি’র বিরুদ্ধে আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সেই জামায়াতের সহায়তা গ্রহণ করলো। ফলে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন চাপা পড়ে যায়। আওয়ামী লীগ ক্ষমাসীর হওয়ার পরও শহীদ জননী জাহানারা ইমামের আন্দোলনের দাবি বাস্তবায়ন করা হয়নি। এভাবেই এক সময় ২০০১ সালে আবার বিএনপি ক্ষমতায় আসে এবং জামায়াত রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। এ সময়েই সারাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করে। রাষ্ট্রীয় মদদে ধর্মীয় রাজনীতির নামে প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী রাজনীতি শুরু করে জামায়াত। জামায়াতের সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন নামে দল গঠন করে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তারা জেএমবি, হরকাতুল জেহাদ, আনসার উল্লাহ বাংলা টিমসহ বিভিন্ন নাম গ্রহণ করে। সাংবিধানিকভাবে বাঙালি জাতিসত্ত্বা পরিচয় মুছে দেওয়ার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে তা আর ফিরে আসেনি।
জাতিসত্ত্বা নিয়ে এমন বিতর্কের মাঝে কোন সমাধান ছাড়াই বেড়ে উঠছে নতুন প্রজন্ম।বিষয়টিকে কেউই গুরুত্ব প্রদান করছেন বলে মনে হচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় থাকার মানসে ধর্মীয় বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে এবং জাতিগত বিতর্কের বিষয়টি চেপে যাচ্ছে। অপরদিকে আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মীরাও দেশ, জাতি, কৃষ্টি, ঐতিহ্য তুলে ধরে কোন কার্যক্রম গ্রহণ করছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নেতৃবৃন্দও সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের পেছনেই ছুটছেন। ফলে মানুষের মধ্যে বাঙালি চেতনাবোধটা ম্রিয়মান হয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির মাধ্যমে। সেই ধর্মীয় উন্মদনায় সৃষ্টি হওয়া সেদেশেও সাংষ্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। আর বাংলাদেশ সৃষ্টি হলো যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে সে দেশ ধর্মীয় উন্মাদনায় উন্মত্ত। বড় বিচিত্র ঘটনা।
সেদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। একটি বাস এসে দাঁড়ালো। বাসটির নাম আল-মোক্কা পরিবহণ। এরপর এলো বিসমিল্লাহ পরিবহণ। এমন সব নাম দেখেই মেনে ভেতরে উপর্যুক্ত কথাগুলো ভেসে ওঠে। দেশে কি নেই কোন দল, নেতা বা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, যে আবারো বাঙালি জাতিসত্ত্বাকে ঊর্ধে তুলে ধরে গোটা জাতিকে এসূত্রে আবদ্ধ করবে?

        লিখেছেন– স্পার্টকাসবাংলা

লেখাটির ফেসবুক লিংক দেখতে এখানে ক্লিক করুন  

Comments

comments

Close