আজ: ৮ এপ্রিল, ২০২০ ইং, বুধবার, ২৫ চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ শাবান, ১৪৪১ হিজরী, রাত ১০:৩৯
সর্বশেষ সংবাদ
জেলা সংবাদ ঈশ্বরদীতে বিদেশি নাগরিকসহ ২৭৭ জনের আগমন, নেই হোম কোয়ারেন্টাইনে

ঈশ্বরদীতে বিদেশি নাগরিকসহ ২৭৭ জনের আগমন, নেই হোম কোয়ারেন্টাইনে


পোস্ট করেছেন: নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ০৩/২৩/২০২০ , ৩:০২ অপরাহ্ণ | বিভাগ: জেলা সংবাদ



ঈশ্বরদীতে গত ১ মার্চ হতে ২০ শে মার্চ পর্যন্ত বিদেশি নাগরিকসহ মোট ২৭৭ জনের বিদেশ হতে আগমন ঘটেছে। বিদেশ হতে আগতদের ১৪ দিন হোম কোয়রেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, ইপিজেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশি নাগরিক এবং প্রবাসীরা সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে প্রকাশ্যে চলাফেরা এবং স্বজনদের সাথে মেলামেশা করছেন।

এতে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন ঈশ্বরদীর সাধারণ মানুষ। বিদেশ থেকে সদ্য আগত প্রবাসীরা ঈশ্বরদীর হাট-বাজার, হোটেল-রেঁস্তোরা, বাসটার্মিনাল, সিএনজি স্ট্যান্ড, ফাস্টফুড ও চায়ের দোকানে অবাধে চলাচল করছে। এমনকি বিদেশিদের অবাধ চলাফেরার সময় মাস্কও ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে না।

ইমিগ্রেশন হতে ঈশ্বরদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রেরিত তথ্যে দেখা যায়, গত ১ মার্চ হতে ২০ শে মার্চ পর্যন্ত ১৯০ জন বিদেশি নাগরিক এবং ৮৭ জন স্থানীয় বাংলাদেশি ঈশ্বরদীতে এসেছে। বিদেশিদের মধ্যে রয়েছে, ১৫৭ জন রাশিয়ান, ১৮ জন বেলারুশীয়, ইউক্রেনের ৫ জন, জার্মানির ২ জন, কোরিয়ান ২ জন, জাপানিজ ২ জন, চাইনিজ ১ জন, ফিলিপাইনের ১ জন, ব্রিটেনের ১ জন এবং কাজাখিস্তানের ১ জন। রাশিয়া, বেলারুশ, জার্মানি, ইউক্রেন, ব্রিটেন ও কাজাখিস্তানের নাগরিকরা সকলেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত।

জাপান, চীন ও কোরিয়ানরা ঈশ্বরদী ইপিজেডে এবং ফিলিপাইনের ১ জন মল্লিক গ্রুপ এন্ড ইন্ডাষ্ট্রিজে কর্মরত। তবে ইপিজেডের ২ জন জাপানিজ ছাড়া ইপিজেডের অন্যান্য বিদেশিদের ১ মার্চ হতে ৭ই মার্চ এর মধ্যে আগমণ ঘটেছে। এই বিবেচনায় ১৪ দিন হোম কোয়রেন্টাইনের মেয়াদ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে।

এছাড়াও প্রবাসীরা মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, কাতার, কুয়েত,ওমান, জর্ডান, ইতালি ও কানাডা হতে দেশে প্রবেশ করেছে। মুজিববর্ষ উদযাপনের আগে পর্যন্ত হোম কোয়ারেন্টাইনের বিষয়ে তেমন একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। যে কারণে বিদেশ হতে আগত বিদেশি নাগরিক ও প্রবাসীরা অবাধে চলাচল করেছে।

১ মার্চ হতে ৮ মার্চের মধ্যে যারা প্রবেশ করেছেন, এদের বেশিরভাগই হোম কোয়ারেন্টাইনে ছিল না। ২২ মার্চ পর্যন্ত হোম কোয়রেন্টাইনের ১৪ দিন মেয়াদ উত্তীর্ণ হলেও এরা করোনা ভাইরাসের জীবাণু মুক্ত কিনা, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোন ব্যবস্থা ঈশ্বরদীতে নেই।

এরপর ৯ মার্চ হতে ২০ শে মার্চের মধ্যে মোট ১২০ জন বিদেশ হতে বাংলাদেশে এসেছে। এদের মধ্যে ৯২ জন বিদেশি এবং ২৮ জন বাংলাদেশি প্রবাসী। বিদেশিদের ২ জন ইপিজেডের জাপানি নাগরিক। অন্যান্যদের বেশীরভাগই রাশিয়ান, যারা রূপপুর প্রকল্পে কর্মরত।

রূপপুরে কর্মরত বিদেশিরা প্রকল্পের আবাসন গ্রীণসিটি ও বাংলা কুটির ছাড়াও ঈশ্বরদী শহরের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে বসবাস করেন। ইপিজেডের ওই ২ জাপানি পিয়ারাখালিতে বাড়ি ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন। বিদেশ হতে আগতরা হোম কোয়ারেন্টাইন মানার পর স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষ করে অবাধে বিচরণ করার সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। বিদেশি ও প্রবাসীরা হোম কোয়ারেন্টাইন না করেই অবাধে চলাফেরা করছেন বলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগ মত প্রকাশ করেছেন।

এবিষয়ে ঈশ্বরদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আসমা খান বলেন, আমাদের সচেতন করার বিষয়ে কথা বলা ছাড়া আর কিছু করার উপায় নেই। ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখা হলেও করোনা সনাক্তকরণের ব্যবস্থা নেই।

প্রবাসীদের হোম কোয়ারেন্টাইনের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা অল্প কয়েকজনের বাড়িতে গিয়ে তাদের ১৪ দিন বাইরে বের না হওয়ার জন্য বলেছি। হাসপাতালের স্বল্প জনবল দিয়ে এবং অন্যদের সঠিক ঠিকানা না পাওয়ায় খোঁজ নেওয়া সম্ভব হয়নি।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসপাতালের রাশিয়ান ভাষা জানা আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শামীমকে রবিবার সন্ধ্যার পর রূপপুর প্রকল্পের আবাসন প্রকল্প গ্রীণসিটিতে গিয়ে বিফল হয়ে ফিরে এসেছেন।

ডা. শামীম বলেন, সদ্য আগত রাশিয়ান সনাক্ত করার জন্য হাতে সীল দিতে গিয়ে কোন সহায়তা পাওয়া যায়নি। রাশিয়ানদের কেউ কেউ সদ্য আগতদের যে রুম দেখিয়েছিল, সেখানে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি।

তিনি আরো বলেন, সদ্য আগত বিপুল সংখ্যক বিদেশি ও প্রবাসীদের দেখভালের জন্য স্বল্প জনবল, পিপিইসহ প্রটেকশনের কোন সরঞ্জাম না থাকায় আমরাই চরম নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগের সাথে দিন কাটাচ্ছি।

সদ্য আগত প্রবাসীদের প্রসঙ্গে ঈশ্বরদী থানার অফিসার (তদন্ত) জানান, আগত ৮৭ জনের মধ্যে ঠিকানা খুঁজে মাত্র ১৬জন বাংলাদেশির বাড়িতে গিয়ে ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিহাব রায়হান জানান, রূপপুর প্রকল্পে কর্মরত বিদেশিদের বিষয়টি স্পর্শকাতর। তাদের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক বরাবরে তালিকা প্রেরণ করে জানানো হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, প্রকল্প এলাকা প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত এবং সেনাবাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যারা সম্প্রতি এসেছে তাদের প্রকল্প এলাকায় কাজের জন্য প্রবেশের সিকিউরিটি পাশ ইস্যু করা হয়নি বলে সেনাবাহিনী নিশ্চিত করেছে। তবে গত দুই দিনে বিদেশিদের অবাধে চলাফেরা অনেকটাই কমে গেছে বলে তিনি জানিয়েছেন। প্রবাসীদের যে তালিকা পাঠানো হয়েছে, তাতে যে ঠিকানা রযেছে সেটি বিমানবন্দরে প্রবেশের সময় পূরণকৃত তথ্য ফরম। এতে পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা না থাকায় বিপুল সংখ্যক প্রবাসীর সঠিক অবস্থান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি এবং স্থানীয়ভাবেও করোনার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তাসত্ত্বেও বিদেশি ও প্রবাসীদের গতিবিধি রোধ করা যাচ্ছে না।

রূপপুর প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর জানান, করোনা বিষয়ে বাংলাদেশ ও রাশিয়ান সরকারের গাইডলাইন ও বিধি বিধান অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রকল্প এলাকায় প্রবেশের সময় নিয়মিত তাপমাত্রা পরিমাপ ও স্ক্যান করা হচ্ছে। যাদের তাপমাত্রা বেশী তাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। দেশীয় কর্মীদের সুরক্ষায় হ্যান্ড স্যানিটাইজেশন, হেক্সোসলসহ অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে।

সদ্য আগতদের হোম কোয়ারেন্টাইনের বিষয়ে তিনি বলেন, রাশিয়ান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের লোকদের ১৪ দিনের যে বিধি-বিধান তা মেনে চলার জন্য পত্র দেওয়া হয়েছে। সেভাবেই বিধি বিধান মেনে রূপপুরের কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ নির্মাণ প্রকল্প ও ঈশ্বরদী ইপিজেড এর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ১২টি দেশের প্রায় ২ হাজার বিদেশি নাগরিক ঈশ্বরদীতে বসবাস করছে। এসব বিদেশি নাগরিক প্রায়ই নিজ দেশে যাতায়াত করেন এবং রূপপুর প্রকল্প ও ইপিজেডের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পরিদর্শনে আসছেন বিদেশিরা। এসব বিদেশি নাগরিক অবাধে ঈশ্বরদী বাজার ও বিভিন্ন স্থানে অবাধে চলাচল করছে। এসব বিদেশিদের দ্বারা করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। পাশাপাশি যেসব প্রবাসী দেশে ফিরেছেন, তারাও নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

Share

Comments

comments

Close